প্রতিবেদন ২৭ জুন ২০২৬,
দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রাম, মামলা-হামলা, নির্যাতন ও নানা প্রতিকূল পরিস্থিতি মোকাবিলা করে বছরের পর বছর রাজপথে সক্রিয় থাকা বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর অনেক তৃণমূল নেতাকর্মী এখনো তাদের প্রাপ্য মূল্যায়ন থেকে বঞ্চিত রয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। দলের কঠিন সময়ে সংগঠনকে টিকিয়ে রাখতে যেসব নেতাকর্মী নিরলসভাবে কাজ করেছেন, তাদের অনেকেই বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় অবহেলার শিকার হচ্ছেন বলে দাবি করছেন সংশ্লিষ্টরা।
তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীদের অভিযোগ, দলের দুঃসময়ে যারা মাঠে থেকে আন্দোলন-সংগ্রাম করেছেন, কারাবরণ করেছেন, হামলা-মামলা ও নির্যাতনের শিকার হয়েছেন, রাজনৈতিক পরিস্থিতির পরিবর্তনের পরও তাদের অনেকেই সাংগঠনিকভাবে যথাযথ গুরুত্ব পাচ্ছেন না। বরং সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন সুবিধাবাদী, ‘হাইব্রিড’ ও অনুপ্রবেশকারী হিসেবে পরিচিত ব্যক্তিরা এলাকায় প্রভাব বিস্তার করে গুরুত্বপূর্ণ পদ-পদবির দৌড়ে এগিয়ে যাচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয় পর্যায়ের অনেক নেতা-কর্মীর মতে, দীর্ঘদিন ধরে দলের জন্য নিবেদিতপ্রাণ হয়ে কাজ করা কর্মীদের বাদ দিয়ে হঠাৎ করে সুযোগ বুঝে দলে সক্রিয় হওয়া ব্যক্তিরা যদি নেতৃত্বের আসনে বসেন, তাহলে প্রকৃত ত্যাগীদের মধ্যে হতাশা তৈরি হওয়াই স্বাভাবিক। এতে সাংগঠনিক শৃঙ্খলা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি দলের প্রতি নিবেদিত কর্মীদের মনোবলও দুর্বল হয়ে পড়তে পারে।
তৃণমূল নেতাকর্মীরা বলছেন, বিএনপির রাজনৈতিক ইতিহাসে এমন অনেক কর্মী রয়েছেন, যারা ব্যক্তিগত স্বার্থ কিংবা পদ-পদবির আশায় নয়, বরং দলের আদর্শ ও গণতান্ত্রিক আন্দোলনের প্রতি বিশ্বাস রেখে বছরের পর বছর সংগ্রাম করেছেন। বহু নেতা-কর্মী কারাগারে থেকেছেন, আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছেন, পরিবার নিয়ে দুর্বিষহ সময় পার করেছেন। অথচ আজ রাজনৈতিক পরিবেশ তুলনামূলক অনুকূলে এলেও তাদের সেই ত্যাগের যথাযথ মূল্যায়ন অনেক ক্ষেত্রেই চোখে পড়ছে না।
তাদের দাবি, শুধুমাত্র প্রভাব, পরিচয় কিংবা সাময়িক রাজনৈতিক সুবিধার ভিত্তিতে নয়; বরং একজন নেতার অতীত ভূমিকা, সাংগঠনিক দক্ষতা, ত্যাগ এবং দলের প্রতি দীর্ঘদিনের অবদানের ভিত্তিতেই মূল্যায়ন হওয়া উচিত। এতে দলের ভেতরে স্বচ্ছতা ও আস্থার পরিবেশ তৈরি হবে এবং নিবেদিত কর্মীদের মধ্যে নতুন উদ্দীপনা সৃষ্টি হবে।
এছাড়াও দলের দুঃসময়ে প্রবাসে থেকেও যারা বিএনপির পাশে ছিলেন, তাদের অবদানের কথাও ভুলে গেলে চলবে না। বিভিন্ন দেশের প্রবাসী বিএনপির নেতাকর্মীরা কঠিন সময়ে দেশের দলীয় নেতাকর্মীদের পাশে দাঁড়িয়েছেন। মামলা পরিচালনা, হাজিরা, দলীয় কর্মসূচি, আন্দোলন-সংগ্রামসহ নানা প্রয়োজনে তারা নিজেদের কষ্টার্জিত অর্থ দিয়ে সহযোগিতা করেছেন।
প্রবাসে থেকেও তারা দলের জন্য নিয়মিত যোগাযোগ রেখেছেন এবং তৃণমূল নেতাকর্মীদের সাহস ও সমর্থন দিয়েছেন। কিন্তু রাজনৈতিক পরিস্থিতির পরিবর্তনের পর অনেক প্রবাসী বিএনপির অভিযোগ যাদের পাশে তারা দুঃসময়ে দাঁড়িয়েছেন, তাদের অনেকেই এখন আর আগের মতো খোঁজখবর রাখছেন না।
দলের জন্য নীরবে অবদান রাখা এসব প্রবাসী নেতাকর্মীর প্রত্যাশা, সুসময়েও যেন তাদের ত্যাগ ও সহযোগিতার কথা স্মরণ করা হয়। কারণ একটি দলের শক্তি শুধু রাজপথের কর্মীদের মাধ্যমে নয়, দেশের বাইরে থেকেও যারা দলের জন্য কাজ করেন, তাদের অবদানও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
তৃণমূল নেতাকর্মী ও প্রবাসী সমর্থকদের যথাযথ মূল্যায়ন করা হলে সংগঠন আরও ঐক্যবদ্ধ ও শক্তিশালী হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
তৃণমূলের অনেক নেতাকর্মীর ভাষ্য, বর্তমানে যারা বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা কিংবা পদ-পদবির আশায় দলে সক্রিয় হচ্ছেন, তাদের একটি অংশ অতীতে দলের দুঃসময়ে পাশে ছিলেন না। অথচ বছরের পর বছর যারা আন্দোলনের মাঠে ছিলেন, তারাই এখন নানা কারণে পিছিয়ে পড়ছেন। এ ধরনের পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে সাংগঠনিকভাবে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তারা।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদেরও অভিমত, একটি দলের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো তার তৃণমূল সংগঠন। মাঠপর্যায়ের পরীক্ষিত ও ত্যাগী নেতাকর্মীদের মূল্যায়ন নিশ্চিত করা গেলে সংগঠন আরও শক্তিশালী ও সুসংগঠিত হয়। বিপরীতে, দীর্ঘদিনের কর্মীদের অবমূল্যায়ন করা হলে দলীয় ঐক্য ও সাংগঠনিক ভিত্তি দুর্বল হওয়ার ঝুঁকি থাকে।
তৃণমূল নেতাকর্মীদের প্রত্যাশা, বিএনপির নীতিনির্ধারকরা বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করবেন এবং দীর্ঘদিন ধরে দলের জন্য ত্যাগ স্বীকার করা, নির্যাতনের শিকার হওয়া ও পরীক্ষিত নেতাকর্মীদের যথাযথ সম্মান, মর্যাদা এবং সাংগঠনিক মূল্যায়ন নিশ্চিত করবেন। পাশাপাশি সুবিধাবাদী ও অনুপ্রবেশকারীদের বিষয়ে সতর্ক অবস্থান নিয়ে দলের আদর্শিক ভিত্তিকে আরও সুসংহত করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
তাদের বিশ্বাস, দুঃসময়ের পরীক্ষিত সৈনিকদের মূল্যায়ন নিশ্চিত করা গেলে দলের প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা আরও বৃদ্ধি পাবে এবং ভবিষ্যতের রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বিএনপি আরও সুসংগঠিত ও শক্তিশালী অবস্থানে যেতে সক্ষম হবে।