বরিশালের গৌরনদী উপজেলার ভূরঘাটা বাসস্ট্যান্ড এলাকায় তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে মাদারীপুরের কালকিনি ও বরিশালের গৌরনদীর দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এ সময় দফায় দফায় ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া, বোমাবাজি ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। এতে উভয় পক্ষের অন্তত ২০ জন আহত হয়েছেন। সংঘর্ষের সময় বেশ কয়েকটি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের অভিযোগ উঠেছে।
শুক্রবার ২ অক্টোবর সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে সংঘর্ষের সূত্রপাত হয়। পরে প্রায় দুই ঘণ্টা ধরে থেমে থেমে সংঘর্ষ চলতে থাকে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ও রাবার বুলেট নিক্ষেপ করে। সংঘর্ষের কারণে ঢাকা-বরিশাল মহাসড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। এতে মহাসড়কের উভয় পাশে বিপুলসংখ্যক যানবাহন আটকা পড়ে।
স্থানীয় বাসিন্দা, ব্যবসায়ী, প্রত্যক্ষদর্শী ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় ভূরঘাটা বাসস্ট্যান্ডের একটি লোকাল বাসের কাউন্টারে টিকিট কাটাকে কেন্দ্র করে টিকিট মাস্টার ঝন্টু দাস (৬৫) ও মাদারীপুরের কালকিনি উপজেলার মসজিদবাড়ি এলাকার হাবুল বেপারীর (৪৭) মধ্যে কথা-কাটাকাটি ও হাতাহাতির ঘটনা ঘটে। ওই ঘটনাকে কেন্দ্র করে শুক্রবার দিনভর দুই এলাকার লোকজনের মধ্যে উত্তেজনা বিরাজ করে।
এরই ধারাবাহিকতায় শুক্রবার সন্ধ্যার দিকে দুই পক্ষের লোকজন ভূরঘাটা এলাকায় জড়ো হলে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ শুরু হয়। একপর্যায়ে পরিস্থিতি ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া ও বোমাবাজিতে রূপ নেয়।
সংঘর্ষে শামছুল হক (৪৮), স্বজল বেপারী (২৫), মিজান মুন্সী (৪৫), ইস্রাফিল (৩৫), সিদ্দিক সরদার (৫০), তমাল, সজীব হোসেন ও হুমায়ুন কবির (৫২)সহ অন্তত ২০ জন আহত হয়েছেন। গুরুতর আহত পাঁচজনকে গৌরনদী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়েছে। অন্য আহতদের গৌরনদী ও কালকিনি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে।
স্থানীয় ব্যবসায়ীরা অভিযোগ করেন, সংঘর্ষ চলাকালে কালকিনি এলাকার একদল লোক ভূরঘাটা বাসস্ট্যান্ডের অন্তত ১৫টি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে হামলা চালিয়ে ভাঙচুর ও মালামাল নিয়ে যায়। ক্ষতিগ্রস্ত দোকানগুলোর মধ্যে মুদি, পার্স ও ভ্যারাইটি স্টোর রয়েছে। ব্যবসায়ীদের দাবি, লুট হওয়া পণ্য ও মালামালের আনুমানিক মূল্য প্রায় ৫০ লাখ টাকা।
ভূরঘাটা বাসস্ট্যান্ডের ব্যবসায়ী সিদ্দিক সরদার বলেন, কালকিনির মসজিদবাড়ি এলাকা থেকে কয়েক ডজন লোক লাঠিসোঁটা ও ধারালো অস্ত্র নিয়ে ভূরঘাটায় আসে। পরে স্থানীয় কয়েকজন যুবক তাঁদের বাধা দিতে গেলে দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ বেধে যায়।
গৌরনদী উপজেলা যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক কাওছার তালুকদার অভিযোগ করেন, কালকিনির মসজিদবাড়ি এলাকার মোফাজ্জেল সরদার ও বায়জীদ সরদারের নেতৃত্বে লোকজন অস্ত্র, লাঠিসোঁটা ও বোমা নিয়ে ভূরঘাটায় হামলা চালায়। একই সঙ্গে তিনি কালকিনি থানা পুলিশের বিরুদ্ধে পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ করেন।
তবে অভিযোগ অস্বীকার করে কালকিনির মোফাজ্জেল হোসেন বলেন, গৌরনদীর লোকজন আগে কালকিনি এলাকায় হামলা চালায়। এর পরিপ্রেক্ষিতেই পাল্টাপাল্টি সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।
ডাসার থানার যুবদলের সদস্যসচিব বায়জীদ সরদারও তাঁর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ অস্বীকার করেন। তাঁর ভাষ্য, টিকিট কাউন্টারে ঘটে যাওয়া ঘটনার মীমাংসার উদ্দেশ্যে শুক্রবার রাতে তিনি ভূরঘাটা বাসস্ট্যান্ডে যান। সেখানে তাঁকে লাঞ্ছিত করা হলে বিষয়টি ছড়িয়ে পড়ে এবং কালকিনি এলাকার লোকজন সেখানে জড়ো হন। পরে গৌরনদীর লোকজন কালকিনির মসজিদবাড়ি এলাকায় হামলা চালিয়ে কয়েকজনকে আহত করে। এরপরই বড় ধরনের সংঘর্ষের সূত্রপাত হয়। ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে হামলা ও লুটপাটের সঙ্গে তাঁদের কোনো সম্পৃক্ততা নেই বলেও দাবি করেন তিনি।
কালকিনি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জহিরুল আলম বলেন, পুলিশ নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালন করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এনেছে। পুলিশের বিরুদ্ধে পক্ষপাতের অভিযোগ সঠিক নয়।
গৌরনদী মডেল থানার ওসি তারিক হাসান রাসেল বলেন, বর্তমানে এলাকার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। নতুন করে সংঘর্ষ এড়াতে ভূরঘাটা এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। লিখিত অভিযোগ পাওয়া গেলে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সংঘর্ষের খবর পেয়ে রাত সাড়ে ৯টার দিকে কালকিনি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা কিশোর কুমার, কালকিনি থানার ওসি জহিরুল আলম, ডাসার থানার ওসি সোলায়মান মাহমুদ এবং গৌরনদী মডেল থানার ওসি তারিক হাসান রাসেল ঘটনাস্থলে যান। পরে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা হয়।
পুলিশ জানিয়েছে, ভূরঘাটা এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন রয়েছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে সেখানে নজরদারি অব্যাহত রয়েছে।