দীর্ঘ রাজনৈতিক অস্থিরতার পর দেশ যখন একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের দোরগোড়ায়, ঠিক তখনই নতুন করে সহিংসতা ও নৈরাজ্যের আবির্ভাব গভীর উদ্বেগের জন্ম দিচ্ছে। দেশের বিভিন্ন স্থানে রাজনৈতিক নেতা-কর্মীদের ওপর হামলা, প্রকাশ্য গুলি করে হত্যা এবং পরিকল্পিত গুপ্তহত্যার ঘটনাগুলো সাধারণ মানুষের মনে ভীতি ও অনিশ্চয়তা তৈরি করছে। নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি হওয়ার কথা থাকলেও বাস্তব চিত্র তার বিপরীত ইঙ্গিতই দিচ্ছে।
রাজধানীর তেজগাঁওয়ে স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতা আজিজুর রহমান মুছাব্বিরকে প্রকাশ্যে হত্যা, গাজীপুরে এনসিপি নেতার ওপর হামলা কিংবা ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান বিন হাদির হত্যাকাণ্ড—এসব ঘটনাকে বিচ্ছিন্ন বলে দেখার সুযোগ নেই। সময়, স্থান ও ঘটনার ধরন বিশ্লেষণ করলে স্পষ্ট হয়, এগুলোর পেছনে একটি সুপরিকল্পিত ষড়যন্ত্র সক্রিয় রয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নির্বাচন প্রক্রিয়ার বাইরে থাকা বা প্রভাব হারানো কিছু শক্তি পরিকল্পিতভাবে অস্থিরতা সৃষ্টি করে নির্বাচনের পরিবেশকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে চাইছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ড. আনোয়ারউল্লাহ চৌধুরীর ভাষায়, পরাজিত ও সুবিধাবঞ্চিত শক্তিই এসব হত্যাকাণ্ডে ইন্ধন জুগিয়ে নির্বাচন বানচালের পথে হাঁটছে।
পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে রাজনৈতিক দলগুলোর পারস্পরিক অবিশ্বাস ও অভিযোগের রাজনীতি। বিএনপি, জামায়াত ও এনসিপিসহ বিভিন্ন দলের মধ্যে প্রশাসনিক পক্ষপাতিত্ব নিয়ে পাল্টাপাল্টি অভিযোগ ক্রমেই উত্তাপ বাড়াচ্ছে। মনে রাখতে হবে, প্রমাণহীন অভিযোগ কেবল বিভাজন বাড়ায় এবং শেষ পর্যন্ত অস্থিতিশীলতা সৃষ্টিকারীদেরই সুবিধা করে দেয়। তাই যেকোনো অভিযোগ হতে হবে সুস্পষ্ট তথ্য ও নির্ভরযোগ্য প্রমাণের ভিত্তিতে, নতুবা অবিশ্বাসের সংস্কৃতি নির্বাচনী প্রক্রিয়াকে গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করবে।
এই প্রেক্ষাপটে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির সাম্প্রতিক পরিসংখ্যানও উদ্বেগজনক। প্রাপ্ত তথ্যমতে, ২০২৫ সালে সারা দেশে খুনের ঘটনা ঘটেছে ৩ হাজার ৭৬৭টি, যা আগের বছরের তুলনায় ৩২৭টি বেশি। শুধু ঢাকাতেই প্রতি মাসে গড়ে প্রায় ২০টি হত্যাকাণ্ড ঘটছে। পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থার তথ্যে জানা যায়, এসব অপরাধের একটি বড় অংশ চাঁদাবাজি ও এলাকায় আধিপত্য বিস্তারের সঙ্গে জড়িত হলেও, এর সঙ্গে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ‘টার্গেট কিলিং’-এর প্রবণতাও স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
এমন পরিস্থিতিতে নির্বাচন কমিশন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দায়িত্ব আরও বেড়ে গেছে। তাদের কঠোর, পেশাদার ও সর্বতোভাবে নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করতে হবে। প্রশাসনের কোথাও শৈথিল্য বা পক্ষপাতিত্ব থাকলে তা অবিলম্বে চিহ্নিত করে সংশোধন করা জরুরি। একই সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোকেও সংকীর্ণ দলীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
মনে রাখতে হবে, একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন শুধু ক্ষমতার পালাবদলের বিষয় নয়; এটি গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রার ভিত্তি। নির্বাচন বানচালের যেকোনো ষড়যন্ত্র রুখে দিতে দল-মত নির্বিশেষে সবাইকে সজাগ ও ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। জনগণের ভোটাধিকার নিশ্চিত করা এবং একটি শান্তিপূর্ণ, স্থিতিশীল বাংলাদেশ গড়ে তুলতে এ মুহূর্তে সর্বোচ্চ দায়িত্বশীলতা, সতর্কতা ও জাতীয় ঐক্যের কোনো বিকল্প নেই।
লেখাটি লিখেছেন লেখক , সাংবাদিক , সমাজকর্মী , শিক্ষানবিশ আইনজীবী সোয়েব সিকদার (পিইউবি, এলএলবি .এলএলএম )
বিষয় : নির্বাচন সাংবাদিক সোয়েব সিকদার
.png)
বৃহস্পতিবার, ১৫ জানুয়ারি ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১১ জানুয়ারি ২০২৬
দীর্ঘ রাজনৈতিক অস্থিরতার পর দেশ যখন একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের দোরগোড়ায়, ঠিক তখনই নতুন করে সহিংসতা ও নৈরাজ্যের আবির্ভাব গভীর উদ্বেগের জন্ম দিচ্ছে। দেশের বিভিন্ন স্থানে রাজনৈতিক নেতা-কর্মীদের ওপর হামলা, প্রকাশ্য গুলি করে হত্যা এবং পরিকল্পিত গুপ্তহত্যার ঘটনাগুলো সাধারণ মানুষের মনে ভীতি ও অনিশ্চয়তা তৈরি করছে। নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি হওয়ার কথা থাকলেও বাস্তব চিত্র তার বিপরীত ইঙ্গিতই দিচ্ছে।
রাজধানীর তেজগাঁওয়ে স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতা আজিজুর রহমান মুছাব্বিরকে প্রকাশ্যে হত্যা, গাজীপুরে এনসিপি নেতার ওপর হামলা কিংবা ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান বিন হাদির হত্যাকাণ্ড—এসব ঘটনাকে বিচ্ছিন্ন বলে দেখার সুযোগ নেই। সময়, স্থান ও ঘটনার ধরন বিশ্লেষণ করলে স্পষ্ট হয়, এগুলোর পেছনে একটি সুপরিকল্পিত ষড়যন্ত্র সক্রিয় রয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নির্বাচন প্রক্রিয়ার বাইরে থাকা বা প্রভাব হারানো কিছু শক্তি পরিকল্পিতভাবে অস্থিরতা সৃষ্টি করে নির্বাচনের পরিবেশকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে চাইছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ড. আনোয়ারউল্লাহ চৌধুরীর ভাষায়, পরাজিত ও সুবিধাবঞ্চিত শক্তিই এসব হত্যাকাণ্ডে ইন্ধন জুগিয়ে নির্বাচন বানচালের পথে হাঁটছে।
পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে রাজনৈতিক দলগুলোর পারস্পরিক অবিশ্বাস ও অভিযোগের রাজনীতি। বিএনপি, জামায়াত ও এনসিপিসহ বিভিন্ন দলের মধ্যে প্রশাসনিক পক্ষপাতিত্ব নিয়ে পাল্টাপাল্টি অভিযোগ ক্রমেই উত্তাপ বাড়াচ্ছে। মনে রাখতে হবে, প্রমাণহীন অভিযোগ কেবল বিভাজন বাড়ায় এবং শেষ পর্যন্ত অস্থিতিশীলতা সৃষ্টিকারীদেরই সুবিধা করে দেয়। তাই যেকোনো অভিযোগ হতে হবে সুস্পষ্ট তথ্য ও নির্ভরযোগ্য প্রমাণের ভিত্তিতে, নতুবা অবিশ্বাসের সংস্কৃতি নির্বাচনী প্রক্রিয়াকে গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করবে।
এই প্রেক্ষাপটে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির সাম্প্রতিক পরিসংখ্যানও উদ্বেগজনক। প্রাপ্ত তথ্যমতে, ২০২৫ সালে সারা দেশে খুনের ঘটনা ঘটেছে ৩ হাজার ৭৬৭টি, যা আগের বছরের তুলনায় ৩২৭টি বেশি। শুধু ঢাকাতেই প্রতি মাসে গড়ে প্রায় ২০টি হত্যাকাণ্ড ঘটছে। পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থার তথ্যে জানা যায়, এসব অপরাধের একটি বড় অংশ চাঁদাবাজি ও এলাকায় আধিপত্য বিস্তারের সঙ্গে জড়িত হলেও, এর সঙ্গে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ‘টার্গেট কিলিং’-এর প্রবণতাও স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
এমন পরিস্থিতিতে নির্বাচন কমিশন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দায়িত্ব আরও বেড়ে গেছে। তাদের কঠোর, পেশাদার ও সর্বতোভাবে নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করতে হবে। প্রশাসনের কোথাও শৈথিল্য বা পক্ষপাতিত্ব থাকলে তা অবিলম্বে চিহ্নিত করে সংশোধন করা জরুরি। একই সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোকেও সংকীর্ণ দলীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
মনে রাখতে হবে, একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন শুধু ক্ষমতার পালাবদলের বিষয় নয়; এটি গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রার ভিত্তি। নির্বাচন বানচালের যেকোনো ষড়যন্ত্র রুখে দিতে দল-মত নির্বিশেষে সবাইকে সজাগ ও ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। জনগণের ভোটাধিকার নিশ্চিত করা এবং একটি শান্তিপূর্ণ, স্থিতিশীল বাংলাদেশ গড়ে তুলতে এ মুহূর্তে সর্বোচ্চ দায়িত্বশীলতা, সতর্কতা ও জাতীয় ঐক্যের কোনো বিকল্প নেই।
লেখাটি লিখেছেন লেখক , সাংবাদিক , সমাজকর্মী , শিক্ষানবিশ আইনজীবী সোয়েব সিকদার (পিইউবি, এলএলবি .এলএলএম )
.png)
আপনার মতামত লিখুন